২৫শে মার্চ ১৯৭১ ও দৈনিক সংগ্রাম

১৯৭১ ও দৈনিক সংগ্রাম৭ই মার্চ ১৯৭১। ঐতিহাসিক এক ভাষণে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহবান জানালেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশজুড়ে সে সময় চলছিল অসহযোগ আন্দোলন। সবার মুখে কেবল স্লোগান আর স্লোগান- ‘পদ্মা যমুনা মেঘনা, তোমার আমার ঠিকানা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে যখন সমগ্রদেশ, সমগ্রজাতি স্বাধীনতার স্বপ্নপূরণে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সে সময় ২৫শে মার্চ রাতে কাপুরুষ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাতের আধারে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালির উপর। “অপারেশন সার্চ লাইট”এর নামে চলায় গণহত্যা।

গোটা পৃথিবীকে স্তম্ভিত করে দেওয়া ১৯৬৮ সালের ভিয়েতনামের মাইলাই গ্রামের সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডকে হার মানিয়ে ২৫ মার্চের রাতে বাংলাদেশ জুড়ে সংঘটিত হয় তার চেয়েও শতগুণ নৃশংসতা, বর্বরতা।

দিনটি জাতির কাছে একটু আলাদা। ঐ দিনে শুধু গণহত্যায় চালায়নি হানাদারেরা, গোটা জাতির বাঙালিত্ত্বও নষ্ট করার ব্রত নিয়ে তারা নেমেছিল অপারেশনে।

১৯৭১ ও দৈনিক সংগ্রাম‘বালুচ কসাই’ হিসেবে খ্যাত ল্যাফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানকে পশ্চিম পাকিস্তানে থেকে নিয়ে আসা হয় পূর্ব পাকিস্তানে। অপারেশন সার্চলাইট বাস্তবায়নের জন্য তাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভণর নিযুক্ত করা হয়। পৃথিবীর জখন্যতম এই গণহত্যার যেন কোন সাক্ষী না থাকে সেজন্য বিদেশী সাংবাদিকদের ২৬ মার্চ সকালে ঢাকা থেকে বের করে দেয়া হয়।

সাংবাদিকদের সকল আলোকচিত্র, প্রতিবেদন ও নোট বই আটক করে একটি বিমানে তুলে দেয়া হয়। তারপরও সাইমন ড্রীং নামে এক সাংবাদিক ঢাকায় লুকিয়ে থেকে গোপনে ছবি ও প্রতিবেদন বিদেশে প্রেরণ করলে ওয়াশিংটন পোস্টের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর মানুষ এই গণহত্যার সর্ম্পকে জানে যায়। হৈ চৈ পড়ে যায় বিশ্বব্যাপী।

কিন্তু পাকিস্তান সামরিক জান্তার অপর্কম আড়াল করার কাজে নেমেছিল দৈনিক সংগ্রাম। “এগুলো কোন গণহত্যার ছবি নয়, ‘৭০ এর ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাসের যে অবর্ণনীয় মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল এগুলো তারই ছবি” - ধরনের মিথ্যাচার ও ভ্রষ্টাচারে তখন লিপ্ত ছিল পত্রিকাটি।

২৫ মার্চ রাতে অগ্নি সংযোগে ভষ্মিভূত হলো ইত্তেফাক, সংবাদ ও দি পিপল অফিস। এতে সরকারি ও রাজাকার আলবদর কর্তৃক প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলো ছাড়া এখানকার সব পত্রিকাগুলো বন্ধ হয়ে পড়ে।

যে সময় বাঙলার বীর সাংবাদিকরা কলম যুদ্ধ করেছিল ঠিক সেই মুহূর্তে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকা স্বাধীনতাকামী মানুষের বিপক্ষে, পাকিস্তানীদের পক্ষে মিথ্যা, বানোয়াট ও বিভ্রান্তমূলক খবর ছাপে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল। সে সময়ে দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক ছিলেন-আখতার ফারুক। সাংবাদিকতার নামে দৈনিক সংগ্রামে বীভৎস কুৎসা, মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

২৭ মার্চের দৈনিক ইত্তেফাক২৫শে মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানার তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্প, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল ও জহরুল হক হল সহ সারা ঢাকা শহরে তারা হত্যাযজ্ঞ চালায়। এক রাতের মধ্যেই ঢাকা শহর পরিণত হয় এক মৃত্যুকুপে।

দৈনিক ইত্তেফাক ‘গণহত্যা বন্ধ কর’  সংবাদ প্রকাশিত হয়ে অথচ তৎকালীন পাকিস্তানপন্থী ‘দৈনিক সংগ্রাম’ র্নিলজ্জভেবে একের পর এক মিথ্যাচার করেছিল। এমন কী বর্বর হত্যাযজ্ঞকেও তারা সাধুবাদ জানাতে ছাড়েনি।

৮ এপ্রিল, দৈনিক সংগ্রাম- ২৫ মার্চের গণহত্যাকে ‘ভারতীয় অপপ্রাচারের ব্যর্থতা’ শিরোনাম দিয়ে সম্পাদকীয়

পূর্ব পাকিস্তানের সব গুরুত্বপূর্ণ শহর সামরিকবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থেকে স্বাভাবিকতার দিকে ফিরে এলেও ভারতীয় বেতারে এখনও সেগুলোয় যুদ্ধ চলছে।”

….এমন কি রোকেয়া হলে কিছু হওয়া তো দূরের কথা অন্য হলের দু’চারটা ছেলে এসে আশ্রয় নিয়েছিল বলে জানা যায়।

….ভাতৃদ্বন্দ্বে উদ্যত জাতি শক্রর বিরুদ্ধে গলা মিলিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছে। নুতন করে জাতীয় মীর জাফরদের (মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী জাতীয় নেতৃবৃন্দ-লেখক) তারা চিনবার সুযোগ পেয়েছে। ভারত ও তার এজেন্টদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে যে কোন মূল্যে তারা স্বদেশ ও জাতি রক্ষার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছে।”

১৯৭১ ও দৈনিক সংগ্রাম২ মে, দৈনিক সংগ্রাম- ‘জনগন পাক সেনাবাহিনীর আগমনের অপেক্ষা করেছে’

২৫ মার্চের পর থেকে পাকসেনারা যে অঞ্চলেই অনুপ্রবেশ করেছে, সেখানেই ধ্বংসের তাণ্ডব চালিয়েছে। সেসময় পাকবাহিনীর আগমণের বার্তা পেলেই জনগণ জীবন বাঁচানোর জন্য ঘরবাড়ি সহায়-সম্পদ ফেলে পালাতে শুরু করতো। অথচ সেই পাকবাহিনীকেই জনগণের ভাগ্য বিধাতা বানিয়ে দৈনিক সংগ্রাম ২ মে ‘হিন্দুস্তানী সৈন্যের বর্বরতা’ শীর্ষক সম্প্রাদকীয়তে লিখল-

“যেখানে যে অঞ্চলেই ভারতীয় সৈন্যেরা অনুপ্রবেশ করেছে, সেখানকার জনগণ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় আমাদের পাক সেনাবাহিনীর আগমণের অপেক্ষার করেছে। পাকবাহিনীর আগমণে শান্তি ও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে।”

৩ মে, দৈনিক সংগ্রাম- ২৬ মার্চ পাকিস্তানিদের মুক্তি দিবস হিসেবে ঘোষণা

শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের কন্যা রইসী বেগম পাকিস্তান সামরিক জান্তার পক্ষে একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিটি দৈনিক সংগ্রাম ৩ এপ্রিল প্রথম পাতায় গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করে। ২৬শে মার্চ পাকিস্তানিদের জন্য মুক্তি দিবস শিরোনাম দিয়ে রইসী বেগমের বিবৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়-

“১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ আমাদের সাত কোটি পাকিস্তানিদের জন্য মুক্তি দিবস”

শেখ মুজিবুর রহমান ও তার অনুচরেরা চিরদিনের জন্য মঞ্চ থেকে অপসারিত হয়েছে। শয়তানী শক্তিকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করার শক্তি যেন আমাদের অজেয় সশস্ত্র বাহিনীকে আল্লাহ দান করেন।

১৯৭১ ও দৈনিক সংগ্রাম৮ মে, দৈনিক সংগ্রাম- পাকিস্তান সেনাবাহিনী পাকিস্তান ধ্বংসের হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করেছে

পাক সামরিক জান্তার ২৫ মার্চ রাতে আদিম উন্মত্ততায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালি জাতির ওপর। তাদের হিংস্র নখরে ক্ষত-বিক্ষত ও রক্তাক্ত হয় বাঙলার জনপদ। পাক হানাদারদের বর্বর গণহত্যা ও দানবীয় হত্যাযজ্ঞে স্তম্ভিত হয়ে যায় বিশ্ববিবেক। তাদের এই বিবেববর্জিত ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিন্দা ও প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠে বিশ্বজনমত। পক্ষান্তরে দৈনিক সংগ্রাম সামরিক জান্তা কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের সর্মথন করে এবং খুনি পাক সেনাবাহিনীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠে।

পত্রিকাটি পাক সামরিক সরকারের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সর্মথনে নানা খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করায় এবং তাদের নিন্দনীয় কাজে গর্ববোধ করে ৮ মে “সশস্ত্র বিদ্রোহের পরিকল্পনা” শিরোনাম দিয়ে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করে-

“অবৈধ আওয়ামীলীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান গত ২৬শে মার্চ সশস্ত্র বিদ্রোহের মাধ্যমে স্বাধীন বাঙলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এঁটে সব আয়োজন সম্পন্ন করেছিলেন। সামরিক সরকার তা জানতে পেরেই পঁচিশে মার্চ দিবাগত রাতে আকস্মিক হামলা চালিয়ে তাঁর সে পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দেন এবং পাকিস্তানকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেন।….”

১৯৭১ ও দৈনিক সংগ্রামআরও প্রকাশ করে, এ পরিকল্পনার পেছনে ভরতের সক্রিয় সহযোগীতা ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র থেকেই….জাতির পিতা কায়েদে আজমের নাম নিশানা মুছে নতুন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠা অভিযান চলেছিল। পাকিস্তানের জাতীয় সংঙ্গীতের বদলে বাঙলাদেশের জাতীয় সংঙ্গীত চালু করা হয়েছিল। অবশেষে তেইশে মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা পুড়ে বাঙলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে শুধু মুখেই ঘোষণাটি বাকি রাখা হয়েছিল ২৫শে মার্চের জন্য।

এরূপ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষে সামরিক হস্তক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রশ্নাতীত সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের দায়িত্ব সশস্ত্র বাহিনীর উপরই ন্যস্ত।

..আমাদের বীর পাকসেনারা পঁয়ষট্টির ভারতীয় প্রত্যক্ষ হামলা ও একাত্তরের ভারতীয় পরোক্ষ হামলা যেরূপ অলৌকিককভাবে প্রতিহত ও বিধ্বস্ত করলো তাতে সত্যিই আমরা গর্ববোধ করছি।”

৬ জুন, দৈনিক সংগ্রাম- ২৫শে মার্চ গণহত্যার জন্য পাকিস্তানিদের অভিনন্দন

২৫ মার্চ কালরাতে পাক সেনাবাহিনী আধুনিক সমরাস্ত্রে নিয়ে ঘুমস্ত ঢাকাবাসীর উপর আদিম হিংস্রতায় ঝাপিয়ে পড়ে। রাইফেল, মেশিনগান, কামান ও মর্টারের হিংস্র গর্জনে রাতের নিস্তবন্ধতা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ল। হাহাকার, আর্তচিৎকার ও ক্রন্দনে ২৫ মার্চের রাতে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। ফুটপাত, রাজপথ ও রিকশায় জড়ে উঠল মৃত মানুষের লাশ। নিমিষেই লাশের শহরে পরিণত হলো ঢাকা। অথচ দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকাটি ৬ জুন এসে ঐ গণহত্যার জন্য পাকিস্তানিদের অভিনন্দন জানালো।

তথ্য সূত্রঃ মুক্তিযুদ্ধে দৈনিক সংগ্রামের ভূমিকা– আলী আকবর টাবী


অগ্নিঝরা মার্চ বিভাগের আরো খবর...
সরকারি চাকরিতে কোটা ইস্যুতে  হাইকোর্ট থেকে সমাধান আসা উচিত: প্রধানমন্ত্রী সরকারি চাকরিতে কোটা ইস্যুতে হাইকোর্ট থেকে সমাধান আসা উচিত: প্রধানমন্ত্রী
আইএমএফ ঋণের তৃতীয় কিস্তি পেল বাংলাদেশ আইএমএফ ঋণের তৃতীয় কিস্তি পেল বাংলাদেশ
ভেঙে দেওয়া হচ্ছে সাদিক অ্যাগ্রো ফার্ম ভেঙে দেওয়া হচ্ছে সাদিক অ্যাগ্রো ফার্ম
গণতন্ত্র আছে বলেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র আছে বলেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে: প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পথচলা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পথচলা
আওয়ামী লীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আওয়ামী লীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলুন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবুজ বাংলাদেশ গড়ে তুলুন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
কোরবানির সুস্থ পশু চেনার উপায়, অসুস্থ গরু থেকে সাবধান কোরবানির সুস্থ পশু চেনার উপায়, অসুস্থ গরু থেকে সাবধান
এইডসের গুজবে বিব্রত মমতাজ এইডসের গুজবে বিব্রত মমতাজ
জুনেই ঢাকায় আসতে পারেন নরেন্দ্র মোদি জুনেই ঢাকায় আসতে পারেন নরেন্দ্র মোদি

২৫শে মার্চ ১৯৭১ ও দৈনিক সংগ্রাম
(সংবাদটি ভালো লাগলে কিংবা গুরুত্ত্বপূর্ণ মনে হলে অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।)
tweet